রুশ প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় ট্রাম্পের বিশেষ দূতের মন্তব্য ঘিরে প্রশ্ন। এ দিকে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ওয়াশিংটন ও কিইভের সম্পর্কে টানাপড়েন বাড়ছে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের জাঁকজমকপূর্ণ কনস্টানটাইন প্রাসাদে বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভূয়সী প্রশংসা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। পুতিনকে ‘মানবদরদি’ বলে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “আমার প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে একজন মানবদরদি মানুষ, সে কথা আপনি এত বার বলেন। স্যার, আপনিও একজন মানবদরদি মানুষ। সে জন্য আপনাকে আমি কুর্নিশ জানাই।”

একই সঙ্গে আমেরিকায় রাশিয়ার ডিজেল রফতানি ফের চালু করার চুক্তির জন্য ট্রাম্পের ধন্যবাদও পুতিনের কাছে পৌঁছে দেন উইটকফ। তবে তাঁর এই প্রশংসা এমন এক সময়ে এল, যখন ইউক্রেনের শিশুদের রাশিয়ায় নির্বাসিত করার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাবে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনে ১৭ হাজার ৫০০-রও বেশি সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকৃত মৃতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলেও জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ।

উইটকফের মন্তব্যের সঙ্গে আবার স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে জেলেনস্কিকে নিয়ে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তাঁকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনার পাশাপাশি আমেরিকা ও ইউক্রেনের সম্পর্কেও টানাপড়েন ক্রমশ বাড়ছে।

অসলো থেকে রাশিয়ায় যান উইটকফ। তার আগের দিনই সেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা শান্তি আলোচনায় গতি আনা। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন ইতিমধ্যেই পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে।

পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের যে অংশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়, সেখানে উইটকফ জানান, তাঁরা রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির কিছু প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। তাঁর কথায়, “আমরা কিছু কাগজপত্র এনেছি। আসলে কিছু ভাবনা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে এক ধরনের শান্তিচুক্তির প্রস্তাব। আপনি অবসর সময়ে সেগুলি পড়ে দেখবেন।”

যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মধ্যস্থতার দায়িত্ব ট্রাম্পের কাছ থেকে পাওয়ার পর এটি ছিল উইটকফের নবম রাশিয়া সফর। পুতিনের সঙ্গে বৈঠককে ‘গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করলেও তিনি স্বীকার করেছেন, এখনও ‘গুরুত্বপূর্ণ কাজ’ বাকি রয়েছে। এর পর আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কারিগরি স্তরে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হওয়ার কথা।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, এই আলোচনায় তারা নীতিগত ভাবে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধের অবসানের পর ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিরাপত্তা কী ভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়েই মূলত আলোচনা হবে।

ওয়াশিংটন ও কিইভের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের অন্যতম কারণ রুশ ডিজেল নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত। পুতিনের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে রাশিয়ার ডিজেলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এর পর ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে হামলা বন্ধ করতে অস্বীকার করলে জেলেনস্কিকে সরিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি তোলেন ট্রাম্প।

এর পর থেকে আমেরিকার গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে বলে অভিযোগ করে আসছে কিইভ। পাশাপাশি, ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সামরিক ব্যবহারের উপযোগী সংস্করণ স্টারশিল্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইউক্রেনের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার জেলেনস্কি জানান, অসলোয় উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা ফের দিতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন। কিন্তু স্টারশিল্ড ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ এখনও বহাল রয়েছে। কার নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে অবশ্য পরস্পরবিরোধী খবর সামনে এসেছে।

মঙ্গলবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, মাস্ক ব্যক্তিগত ভাবে পরিষেবার গতি কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্য দিকে, সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, নির্দেশটি এসেছিল হোয়াইট হাউসের ভিতর থেকে।

বুধবার ভারত সফরের সময় মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও বলেন, ইউক্রেনের স্টারশিল্ড ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত মাস্কের। তাঁর কথায়, “আমরা আগে থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানতাম বলে আমার জানা নেই। তবে সেটা অপ্রাসঙ্গিক।”

রুবিও আরও বলেন, পরিষেবাটি কী ভাবে এবং কত গতিতে ব্যবহার করা যাবে, তা একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক চুক্তির শর্তের উপর নির্ভর করে।

এ দিকে, বুধবারের বৈঠকে পুতিন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রী মেলানিয়াকে ধন্যবাদ জানান। কিন্তু আলোচনার পরও অদূর ভবিষ্যতে বড় কোনও অগ্রগতির লক্ষণ স্পষ্ট নয়।

ইউক্রেন বার বার জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করা-সহ যুদ্ধবিরতির আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু শীত এগিয়ে আসার মুখেও ইউক্রেনে বোমাবর্ষণ বন্ধ করার বিষয়ে মস্কোর তরফে স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিত মেলেনি। রাশিয়া মনে করছে, সামরিক চাপ অব্যাহত রাখলে কিইভের কাছ থেকে আরও বেশি ছাড় আদায় করা সম্ভব হতে পারে।

যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনায় পুতিন এখনও তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি থেকে সরে আসতে রাজি নন। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া।

একই সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, মার্কিন বাজারে সারের রফতানি উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়াতে পারে মস্কো।

রুশ কর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকায় ডিজেল নিয়ে প্রথম ট্যাঙ্কারটি বৃহস্পতিবার রওনা দেওয়ার কথা। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় তিন লক্ষ টন ডিজেল পাঠানোর পরিকল্পনার অংশ এটি। তবে সাময়িক ভাবে রুশ ডিজেল আমদানি ফের চালু করার চুক্তি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ক্রেতাদের জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, প্রস্তাবিত আমদানির পরিমাণ এতটাই কম যে বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো কঠিন।

বুধবারের আলোচনায় আগামী মাসে চিনে পুতিন, ট্রাম্প ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের প্রসঙ্গও ওঠে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, তিন নেতার এই ‘নজিরবিহীন’ শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু করেছে বেজিং।

শান্তি আলোচনায় নতুন উদ্যোগের ইঙ্গিত মিললেও যুদ্ধের অবসানের পথ এখনও অনিশ্চিত। এক দিকে পুতিনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা, অন্য দিকে জেলেনস্কিকে নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে ইউক্রেন সংকটে আমেরিকার ভূমিকা এবং কিইভের সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।